কলকাতা: ভারতের নির্বাচন কমিশনের একটা অপরীক্ষিত, কোনো ডকুমেন্ট ছাড়া আর নিয়মিত বদলানো সফটওয়্যার ব্যবহার করার জন্য পশ্চিমবঙ্গের অফিসাররা এখন একটা বড় বিপদে পড়ে গেছে। মাত্র ২০ দিনেরও কম সময়ের মধ্যে রাজ্যের ১.৫ কোটি ভোটারের নাগরিকত্ব, পরিচয় আর ভোট দেওয়ার অধিকার নিয়ে আধা-বিচারিক শুনানি করতে হচ্ছে।

দ্য রিপোর্টার্স কালেকটিভ পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন কমিশনের অফিসিয়াল রেকর্ড আর অভ্যন্তরীণ ডেটা খতিয়ে দেখেছে, তাদের সফটওয়্যার অ্যাপ্লিকেশনগুলো কীভাবে চলছে তা পর্যবেক্ষণ করেছে, পাঁচজন বিধানসভা-স্তরের নির্বাচন অফিসারের সঙ্গে কথা বলেছে, রাজ্য অফিসের একজন সোর্স আর ডজনখানেক বুথ-লেভেল অফিসারের সঙ্গে আলাপ করেছে—এসব করে বোঝার চেষ্টা করেছে যে কীভাবে নির্বাচন কমিশন শেষমেশ রাজ্যের মোট ভোটারদের ১৮ শতাংশেরও বেশি মানুষকে আবার নতুন করে তাদের পরিচয় আর ভোট দেওয়ার অধিকার প্রমাণ করার জন্য লাইনে দাঁড়াতে ডেকে পাঠিয়েছে।

নদীয়া জেলায় একটা শুনানি, পশ্চিমবঙ্গ। ছবির ক্রেডিট: আয়ুশী কর

আমরা দেখলাম যে নির্বাচন কমিশন সুপ্রিম কোর্টকে ভুল বুঝিয়েছে। কোর্টকে ওরা বলেছে, “কোনো অটোমেটেড নোটিশ তৈরি হয় না... ইআরওরা (ইলেকটোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসাররা) মন দিয়ে দেখে সই করেন।”

ইআরওরা হলেন কেন্দ্রস্তরের অফিসার। তাদেরই ক্ষমতা আর দায়িত্ব থাকে বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার তালিকা তৈরি করা, আপডেট করা আর সংশোধন করার।নির্বাচন কমিশন প্রক্রিয়া আর পদ্ধতি ঠিক করে দেয় কীভাবে তালিকা আপডেট হবে।কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী শেষ পর্যন্ত ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করার ক্ষমতা শুধু ইআরওদেরই আছে, কমিশনের নয়।আমাদের তদন্তে দেখা গেছে, সুপ্রিম কোর্টে যা দাবি করেছে কমিশন তার উল্টোটা।পশ্চিমবঙ্গে নোটিশগুলো ব্যাপকভাবে তৈরি হয়েছে কেন্দ্রীয়ভাবে, পরীক্ষা-না-হওয়া অ্যালগরিদম দিয়ে।কমিশন এগুলোকে মিষ্টি করে বলেছে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’।ইআরওদের প্রতিদিন হাজার হাজার এমন কেস রিভিউ করতে হচ্ছে।

তাই তাদের আর কোনো উপায় থাকছে না—কমিশনের সফটওয়্যার যাদের সন্দেহজনক বলে ফ্ল্যাগ করেছে, তাদের লক্ষ লক্ষ নোটিশে মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে যান্ত্রিকভাবে সই করে দিতে হচ্ছে।

কমিশন ২০০২ সালের ভোটার তালিকার কাগজের রেকর্ড ডিজিটাইজ করেছে। বেশিরভাগ রেকর্ড তখন বাংলায় ছিল।

কম্পিউটারের অপরীক্ষিত অ্যালগরিদম দিয়ে সেগুলো ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়েছে। তারপর আরেকটা অ্যালগরিদম ব্যবহার করে ২০০২-এর ডিজিটাইজড তালিকার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

যে ভোটাররা দাবি করেছে যে তারা বা তাদের বড়রা ২০০২-এর তালিকায় ছিলেন—সেই দাবির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে।

সফটওয়্যার এক কোটি ৩১ লক্ষের বেশি ভোটারকে সন্দেহজনক বলে চিহ্নিত করেছে।

 পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের অফিস ভেতরে ভেতরে স্বীকার করেছে যে, রিভিশন প্রক্রিয়ার মাঝপথে যে সফটওয়্যার প্রোটোকল তাড়াহুড়ো করে চালু করা হয়েছিল, সেটা ভুলে ভর্তি ছিল। এতে ভয়ঙ্কর পরিমাণে ভোটারদের ফ্ল্যাগ করা হয়ে গিয়েছিল।

এই ভুল ঠিক করার জন্য, নির্বাচন কমিশন প্রথম কয়েক সপ্তাহের জন্য স্থানীয় নির্বাচনী আধিকারিক আর বুথ-লেভেল কর্মীদের ছোটখাটো ভুলগুলোকে গুরুত্ব না দেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছিল। কিন্তু কমিশন তবু নতুন নতুন ফিল্টার আর ক্রাইটেরিয়া সফটওয়্যারে ঢোকাতে থাকল সন্দেহজনক ভোটারদের চিহ্নিত করার জন্য। আবারও নীতি বদল করল।

কাগজে-কলমে নির্বাচনী আধিকারিকদের বলা হয়েছিল, প্রত্যেক কেসে ‘মন দিয়ে বিবেচনা করে’ নোটিশ পাঠানোর আগে সিদ্ধান্ত নিতে। এটা একটা অসম্ভব কাজ ছিল। ‘ভুল করে ফেলার’ ঝুঁকি নিতে অনিচ্ছুক হয়ে, আর অসম্ভব ডেডলাইনের চাপে পড়ে স্থানীয় নির্বাচনী আধিকারিকরা বিবেচনা-বুদ্ধি ছেড়ে দিলেন।

ইসিআই-র কনস্টিটুয়েন্সি-লেভেল আধিকারিকরা ইসিআই সফটওয়্যারে যে যে বাটন দরকার টিপে দিলেন, বাল্কে নোটিশ প্রিন্ট করলেন, তারপর সবগুলো একসঙ্গে সাইন করে দিলেন।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচনী দফতরের একজন সিনিয়র আধিকারিক দ্য রিপোর্টার্স কালেকটিভকে বলেছেন, ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’ বলে যে অসংখ্য ভোটারকে রেড-ফ্ল্যাগ করা হয়েছে, সেই বিপুল সংখ্যার জন্যই এখন আর ছোটখাটো ডিসক্রিপ্যান্সি থাকা ভোটারদের ফিল্টার করে বাদ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এই সামনের সমন জারি থেকে বাঁচানো যাচ্ছে না।

চলমান স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশনের জন্য সব ভোটারকেই ইসিআই-র কোয়াসি-জুডিশিয়াল সমনের জন্য হাজিরা দিতে হবে, অথবা তাদের পক্ষে কোনো আইনি প্রতিনিধিকে পাঠাতে হবে।

কলকাতার একজন ইলেকটোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার বলেছেন, “বেশিরভাগ দিনই আমরা প্রতিদিন ৪,০০০ করে সমন নোটিশ সাইন করেছিললাম।” শহরের সবচেয়ে বেশি রেড-ফ্ল্যাগড ভোটার থাকা একটা কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা এই আধিকারিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই কথা বলেছেন।

ইসিআই-এর একজন শীর্ষ আধিকারিক যেমন বলেছেন, “এত বড় সংখ্যক নোটিশ তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে যেসব ভোটারের লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি আছে তাদের জন্য। ইআরওদের পক্ষে এই ছোটখাটো ভুলগুলো পরীক্ষা করে বাদ দেওয়া প্রায় অসম্ভব কাজ।”

ইসিআই-এর অভ্যন্তরীণ ডেটা, যেটা দ্য রিপোর্টার্স কালেকটিভ পর্যালোচনা করেছে, সেটা দেখাচ্ছে ২৪শে জানুয়ারি পর্যন্ত একটা বিশাল প্রশাসনিক ব্যাকলগ তৈরি হয়েছে: ১.৫ কোটিরও বেশি সমন নোটিশ তৈরি করা হয়েছে, কিন্তু আধিকারিকরা শুধু ৯৫.৩৯ লক্ষটা পৌঁছে দিয়েছেন, আর ২৪শে জানুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ৩০ লক্ষ ভোটার শুনানিতে হাজির হয়েছেন।

এই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার এক মাস পরেও কমিশন তার পরিকল্পিত শুনানির মাত্র ২০% শেষ করতে পেরেছে। এখন মাত্র তিন সপ্তাহ বাকি আছে বাকি ৮০%—প্রায় ১.২ কোটি ভোটার—প্রক্রিয়া করার জন্য, তারপর ১৪ই ফেব্রুয়ারি ফাইনাল রোল প্রকাশ করতে হবে। এখন পর্যন্ত যাচাই করা ভোটারের সংখ্যা মাত্র ৭.২৪%। এদিকে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এই প্রক্রিয়াটা আরেকবার পরিবর্তন করতে হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যার ফলে ব্যাকলগ আরও বাড়বে।

আমরা এই খবর নিয়ে ইসিআই-কে প্রশ্ন পাঠিয়েছিলাম উত্তর দেওয়ার জন্য। প্রকাশের সময় পর্যন্ত তারা কোনো উত্তর দেয়নি। উত্তর পেলে খবরটা আপডেট করা হবে।

দুটো ডিসক্রেপ্যান্সি , একটা সফটওয়্যার

যখন নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) দেশজুড়ে ১২টা রাজ্য আর কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর)-এ নাগরিকদের অংশ নিতে ডাক দিচ্ছিল, তখন তারা ভোটারদের আশ্বস্ত করেছিল যে ভোটারদের ওপর আমলাতান্ত্রিক ঝামেলা খুবই কম রাখা হবে। কমিশন একটা অভ্যন্তরীণ ম্যাপিং সফটওয়্যার তৈরি করেছিল, যাতে ডিজিটালভাবে বেশিরভাগ ভোটারকে দুই দশক আগে, ২০০২-২০০৪ সালের বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর রোলের সঙ্গে যুক্ত করা যায়। যারা এই ডিজিটাল পরীক্ষায় পাশ করবে, তাদের গণনার জন্য কোনো নথি জমা দিতে হবে না—এমনটাই তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

এই অভিযান শুরু হওয়ার কয়েক মাস পরে, যে সফটওয়্যারটা যথাযথ পরীক্ষা ছাড়াই চালু করা হয়েছিল, সেটা কোটি কোটি ভোটারকে সন্দেহের জালে ফেলে দিয়েছে। শুধু দুটো রাজ্যে—মধ্যপ্রদেশ আর পশ্চিমবঙ্গে—আমরা দেখেছি যে এই নতুন প্রোটোকলের মাধ্যমে ৩.৬৬ কোটিরও বেশি ভোটারকে সন্দেহজনক বলে বিবেচনা করা হয়েছে।

যা ঘটেছে, অন্তত পশ্চিমবঙ্গে, সেটা হলো পরস্পরবিরোধী প্রোটোকলের জটিলতা, যার ফলে নির্বাচনী অফিসাররা হিমশিম খাচ্ছেন। তারা প্রচুর নোটিশ জারি করার চেষ্টা করছেন, সবই আগের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তিন মাসের মধ্যে সংশোধনী শেষ করার আশায়।

যদিও বর্তমানে যে ১২টা রাজ্যে সংশোধনী চলছে, সব জায়গায়ই একই রকম প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে, কিন্তু আমাদের সীমিত সম্পদের কারণে আমরা শুধু একটা রাজ্যের ওপর ফোকাস করেছি—পশ্চিমবঙ্গ। আমরা সিইও অফিসের অফিসার, নির্বাচনী অফিসার, বুথ লেভেল কর্মীদের সাক্ষাৎকার নিয়েছি। আমরা এই সময়ের মধ্যে জারি করা নোটিশ আর চিঠিপত্র দেখেছি, প্রোটোকলের পরিবর্তনগুলো খতিয়ে দেখেছি, আর একটা টাইমলাইন তৈরি করেছি।

ইসিআই-এর অ্যালগরিদম-জেনারেটেড বিশৃঙ্খলা

শুরুতে যখন ইসিআই-এর সফটওয়্যার চালু করা হয়েছিল, তখন সেটা ভোটারদের  তালিকা বহির্ভূত হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। অথচ কাগজের ভোটার তালিকায় তাদের বা তাদের পূর্বপুরুষদের নাম ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় ছিল।

১৬ই ডিসেম্বরে প্রকাশিত পশ্চিমবঙ্গের ড্রাফট ভোটার তালিকা অনুযায়ী, রাজ্যে ৩২ লক্ষেরও বেশি ভোটার তালিকাভুক্ত ছিল না । এর মানে, ইসিআই-এর মতে, তাদের বা তাদের পূর্বপুরুষদের কেউই ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় ছিল না।

২৭শে ডিসেম্বর থেকে এই তালিকা বহির্ভূত  ভোটারদের নোটিশ পাঠানো শুরু হয়। নোটিশে তাদের কোয়াসি-জুডিশিয়াল শুনানিতে হাজিরা দিতে বলা হয়। সেখানে তাদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করার জন্য ১৩টা নির্দিষ্ট ডকুমেন্টের মধ্যে একটা দেখাতে হবে।

কিন্তু প্রথম নোটিশ পাঠানোর মাত্র ৪৮ ঘণ্টা পরেই সফটওয়্যারটাকে মৌলিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করা হয়।

২৯শে ডিসেম্বর জেলা নির্বাচন অফিসারদের কাছে পাঠানো একটা অভ্যন্তরীণ চিঠিতে পশ্চিমবঙ্গের সিইও অফিস স্বীকার করে যে, “২০০২ সালের ইলেকটোরাল রোলকে সিএসভি-তে রূপান্তর করার সময় বিক্ষিপ্ত ত্রুটি হয়েছে।”

এর ফলে ইসিআই অনুমতি দেয় যে, নির্বাচন অফিসাররা কেস-বাই-কেস ভিত্তিতে তালিকা বহির্ভূত  ভোটারদের ব্যক্তিগত শুনানির জন্য ডাকতে পারবে। যদি ম্যানুয়াল পরীক্ষায় হার্ড কপি ইলেকটোরাল রোলে ভোটারের নাম পাওয়া যায়, তাহলে “...বিএলও ডেকে জানাতে পারে যে তাকে (ভোটারকে) হাজিরা দিতে হবে না,” তারা স্পষ্ট করে।

ইসিআই এই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টেও একই কথা জমা দেয়।

ভোটারদের 'তালিকা বহির্ভূত’' হিসেবে চিহ্নিত করে কমিশন আশা করেছিল যে, এভাবে সন্দেহজনক ভোটারদের খুঁজে বের করা যাবে। এর মধ্যে রয়েছে অবৈধ অভিবাসীরা, যারা প্রতারণার মাধ্যমে রাজ্যের ভোটার তালিকায় যুক্ত হয়েছে। কিন্তু এই আশার বিপরীতে, বাংলার মোট ভোটারদের মাত্র ৩ শতাংশকে তালিকা বহির্ভূত  হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সীমান্তবর্তী কেন্দ্রগুলোতেও সংখ্যাটা অপ্রত্যাশিতভাবে কম ছিল।

ইসিআই এখন তার তদন্তের পরিধি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই ম্যাচিং সফটওয়্যার এখন ম্যাপড ভোটারদের মধ্যে 'লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি' খুঁজে বের করতে ব্যবহার করা হচ্ছে। যদি ২০০২ এবং ২০২৫-এর ভোটার তালিকায় নামের বানানে অমিল থাকে, যদি ছয়জন বা তার বেশি ভোটার একই পূর্বপুরুষের সঙ্গে যুক্ত থাকে, অথবা ভোটার আর তার ম্যাপড পূর্বপুরুষের বয়সের পার্থক্য ইসিআই-এর ক্রাইটেরিয়ার  অনুযায়ী ঠিক না হয়, তাহলে তাদের 'লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি' হিসেবে রেড-ফ্ল্যাগ করা হবে।

এখন আরও ১.৩১ কোটি ভোটার ইসিআই-এর সন্দেহের জালে পড়েছে। নোটিশের ডেটা দেখে বোঝা যাচ্ছে যে, তাদের ভৌগোলিক বণ্টন একটা নির্দিষ্ট ধরন অনুসরণ করছে। মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা যেমন মালদা আর মুর্শিদাবাদ, যেগুলো বাংলাদেশের সীমান্তে অবস্থিত, সেগুলোতে লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সির অস্থিতিশীল এলাকা হিসেবে উঠে এসেছে। এই জেলাগুলোতে শুরুতে তালিকা বহির্ভূত ভোটারের শতকরা হার খুবই কম ছিল।

একইভাবে, নদিয়াতে, যেটা সাধারণভাবে এসআইআর শুনানির আরেকটা অস্থিতিশীল এলাকা, জেলার সূত্রগুলো জানাচ্ছে যে, সম্প্রতি ঘোষিত লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সির জন্য যতগুলো শুনানির নোটিশ তৈরি হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি এসেছে কালিগঞ্জ, নাকাশিপাড়া আর পলাশিপাড়া বিধানসভা কেন্দ্র থেকে। এই তিনটি কেন্দ্রেই মুসলিম বাসিন্দাদের উল্লেখযোগ্য ঘনত্ব রয়েছে, যা জনসংখ্যার ২৭ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশেরও বেশি।

রাজ্যের রাজধানীতে কলকাতা পোর্ট বিধানসভা কেন্দ্রটা সবচেয়ে বেশি লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি আর নোটিশ তৈরি করেছে।

এই ঘনবসতিপূর্ণ বিধানসভা কেন্দ্রে মুসলিম জনসংখ্যা অনেক, ভোটারদের প্রায় ৫০ শতাংশ বলে অনুমান করা হয়।

স্থানীয় নির্বাচন অফিসার আর কয়েকজন বুথ-লেভেল অফিসারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে যে, ইসিআই-এর সফটওয়্যারে লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি ধরার জন্য মৌলিক ত্রুটি এখনও রয়ে গেছে।

যে বুথ-লেভেল অফিসাররা এই রিপোর্টারের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাঁরা একমত যে ছোটখাটো অসঙ্গতির কেস অনেক বেশি, গুরুতর ম্যাচ না হওয়ার চেয়ে।

একজন সিনিয়র অফিসার ব্যাখ্যা করেছেন যে, মূল সমস্যাটা হলো সফটওয়্যারটা ভোটার লিস্ট বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করে তারপর ম্যাচ করার চেষ্টা করে।

অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, উপাধির ঐতিহ্যবাহী ইংরেজি স্পেলিং আর সফটওয়্যার যেভাবে বাংলা লিপি থেকে অটোমেটিক ট্রান্সলিটারেশন করে, সেটা আলাদা হয়ে যায়। উদাহরণ দিই— ‘খালখো’ উপাধিটা, যেটা ঝাড়খণ্ড সীমান্তের কাছে ওরাওঁ আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে খুব সাধারণ।

সম্প্রদায়ের বেশিরভাগ সদস্য ইংরেজিতে নিজেদের নাম লেখেন ‘Xalxo’ হিসেবে, কিন্তু সফটওয়্যার বাংলা লিপি থেকে ফোনেটিক স্পেলিং করে ‘Khalkho’ বানিয়ে ফেলে, আর তাতেই লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি তৈরি হয়।

যদি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভোটাররা তাদের নামের লেখায় সামান্য পরিবর্তন করে ফেলে, যেমন ‘Mohammed’ হয়ে যায় ‘Md’, ‘Sheikh’ হয়ে যায় ‘Sk’, ‘Chattopadhyay’ হয়ে যায় ‘Chatterjee’ — এটাও ফ্ল্যাগ হয়ে যাবে।

“এগুলো খুব ছোটখাটো ভুল, যেগুলো একজন বুথ অফিসার মাত্র কয়েক সেকেন্ডে ঠিক করে দিতে পারে, কাউকে ডেকে আনারও দরকার নেই। ওরা তো এই সম্প্রদায়গুলোতেই থাকে; এদের ঠিক কে কে তা ওরা খুব ভালোই জানে,” তৃণমূল কংগ্রেসের একজন বুথ-লেভেল এজেন্ট এই রিপোর্টারকে বললেন। তিনি আর অন্যান্য পার্টির কর্মীরা মিলে খিদিরপুরের একটা এসআইআর শুনানি কেন্দ্রের সামনে একটা অস্থায়ী হেল্প টেন্ট খাটিয়ে বসেছিলেন কলকাতায়।

একই কেন্দ্রের একজন বুথ-লেভেল অফিসার বললেন, “যদি ইসিআই আমাকে রিভিউ করে সিলেক্টিভলি নোটিশ ইস্যু করার অনুমতি দিত, তাহলে আমার বুথে যে অর্ধেক ভোটারকে শুনানির জন্য ডাকা হয়েছে তাদের অনেককেই আসতে হত না।” তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য রিপোর্টার্স কালেকটিভের সঙ্গে কথা বলেছেন।

একজন ভোটার তার বুথ লেভেল অফিসারের সঙ্গে কেন্দ্রে শুনানির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ছবির ক্রেডিট: আয়ুশী কর)
কলকাতা পোর্ট বিধানসভা কেন্দ্রে একজন ভোটারকে পরিচয়পত্র দেখানোর জন্য সমন নোটি দেওয়া হয়েছে। ছবির ক্রেডিট: আয়ুশী কর

এদিকে, তৃণমূল কংগ্রেসের সুপ্রিম কোর্টে লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি নিয়ে যে পিটিশন দাখিল করা হয়েছে, তার জবাবে ইলেকশন কমিশন জানিয়েছে যে ইআরওরা নোটিশ জারি করার আগে 'মনোযোগ দিয়ে' বিবেচনা করছেন।

এই জবাবটা সরাসরি তৃণমূলের যুক্তির বিরুদ্ধে গিয়েছে। তৃণমূল বলেছিল, এত কম সময়ের মধ্যে এত ঘন ঘন এসআইআর শুনানি করা লজিস্টিক্যালি অসম্ভব।

কমিশন কোর্টকে বলেছে, “ইআরওরা নোটিশ জারি করছেন নিজের মনোযোগ দিয়ে বিবেচনা করে, যে তথ্য তাঁর কাছে আছে আর  বিএলও অ্যাপের মাধ্যমে  বিএলও যে তথ্য দিয়েছে—এন্ট্রিগুলো ম্যাপিং আর ২০০২-এর রোলের সঙ্গে তাদের লিঙ্কেজ—সেসব দেখে সই করে।”

পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর-এ ইসিআই কোর্টে জানিয়েছে, নোটি অটোমেটিক্যালি তৈরি হচ্ছে না এবং ইলেকশন অফিসাররা 'মনোযোগ দিয়ে বিবেচনা' করে সই করে নোটি জারি করছেন।

প্রেসে ফাঁস হওয়া তথ্য অনুযায়ী, সিনিয়র ইসিআই অফিসাররা দাবি করেছেন যে বিএলওদের বলা হয়েছে, লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি হিসেবে ফ্ল্যাগ হওয়া ছোটখাটো ভুলগুলো নিজেরাই অভ্যন্তরীণভাবে ঠিক করে নিক, শুনানির জন্য ডাকার দরকার নেই। আমরা বিভিন্ন স্তরের সিনিয়রিটিতে যাচাই করে দেখেছি যে এটা ঠিক নয়।

একজন বুথ-লেভেল অফিসার এই রিপোর্টারকে বলেছেন, “আমি লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি আছে এমন সবাইকে নোটিশ দিয়েছি। একটা অক্ষরের পার্থক্য হলেও কিছু যায় আসে না। আমি রিস্ক নেব না।”

সন্দেহের কনভেয়র বেল্ট

দ্য রিপোর্টার্স কালেকটিভ-এর সঙ্গে কথা বলা ইলেকটোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসাররা (EROs) একটা কনভেয়র বেল্টের মতো বাস্তবতার ছবি এঁকেছেন, যেখানে সমন  জারি করা হয়।

তারা বলেছেন যে, সন্দেহের ভিত্তিতে একের পর এক সমন জারি করার প্রক্রিয়াটা ঠিক যেন একটা  কনভেয়র বেল্টের মতো চলছে।

আমরা দুজন ইআরও-এর সঙ্গে কথা বলেছি, একজন কলকাতার আর একজন নদিয়ার। ওরা কয়েকজন ডেপুটির সঙ্গে মিলে প্রতিদিন ৪,০০০ থেকে ৫,০০০টা ছাপানো শুনানির নোটিশে সই করছে। এই ছাপানো নোটিশগুলো পরে ভোটারদের কাছে হাতে হাতে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে শুনানির জন্য।

নদিয়ার ইআরও আরও বললেন যে, তাঁর ক্ষেত্রে তিনি ম্যাপ না হওয়া সব ভোটারকেও ফোন করছেন, যদিও ইসিআই অফিসারদের অনুমতি দিয়েছে যে সব ম্যাপ না হওয়া ভোটারকে শুনানির সমন না দেওয়া যায়।

যখন আমরা পশ্চিমবঙ্গের সিইও-তে থাকা একজন সিনিয়র ইসিআই অফিসারকে জিজ্ঞাসা করলাম যে, স্থানীয় নির্বাচন অফিসারদের সঙ্গে আমাদের ইন্টারভিউ কেন ইসিআই-এর সুপ্রিম কোর্টে দেওয়া জবাবের সঙ্গে মেলে না?

তিনি খুব খোলাখুলি বললেন, “লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সির কারণে নোটিশগুলো সিলেক্টিভভাবে বাতিল করা প্রায় অসম্ভবের কাজ, কারণ নোটিশের পরিমাণ এতটাই বিশাল।”

তিনি আরও বললেন, “ওরা যা করেছে তা হলো, ইআরও ইআরওনেট (ইসিআই-এর কনস্টিটুয়েন্সি-লেভেল অফিসারদের অ্যাপ্লিকেশন) খুলে দেখছে যে এই অংশে লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সির কারণে এতগুলো নোটিশ তৈরি হয়েছে। তাই সে ওই অংশের নোটিশ ছাপানোর কমান্ড দেবে। ইআরওনেট-এর মধ্যেই। এখন, এটাকে আদৌ মনের প্রয়োগ বলা যায় কি না, নাকি আংশিক প্রয়োগ, নাকি একদমই না—এটা বোধহয় ডিগ্রির প্রশ্ন।”

‘অ্যাপ্লিকেশন অফ মাইন্ড’ কীভাবে আইনত সংজ্ঞায়িত করা যায়? এই শব্দটার অস্পষ্টতার জন্যই ইসিআই সুপ্রিম কোর্টকে ভুল বোঝাতে পেরেছে যে অ্যালগরিদমগুলোই এসআইআর চালাচ্ছে, কনস্টিটুয়েন্সি-লেভেলের আইনত ক্ষমতাপ্রাপ্ত ইআরও-রা নয়। আর এর ফলে পশ্চিমবঙ্গের ১.৫ কোটি মানুষকে লাইনে দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্ব আর অধিকার আবার প্রমাণ করতে হচ্ছে।


এই প্রতিবেদনটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে। সম্পূর্ণ নির্ভুলতার জন্য, অনুগ্রহ করে মূল প্রতিবেদনটি ইংরেজিতে দেখুন।