
নয়াদিল্লি: ভারতীয় নির্বাচন কমিশন পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকার সংশোধন প্রক্রিয়া অর্থাৎ এস আই আর (স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন) চালু করার সময় একটা রাজনৈতিক বয়ান বিশেষ জনপ্রিয় হয়েছিলঃ বলা হচ্ছিল এই প্রক্রিয়া একটা অস্ত্রোপচারের মতো— যার মাধ্যমে হাজার হাজার অবৈধ অনুপ্রবেশকারীকে চিহ্নিত করে বাদ দেওয়া হবে, যারা হয়ত এতদিন বৈধ ভোটার সেজে ছিল।
এই বয়ানকে আরও উস্কে দিয়েছিলেন রাজনৈতিক নেতারা। বাংলায় সংশোধন অভিযানের পরপরই নির্বাচনী প্রচারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রতিশ্রুতি দেন যে, “অবৈধ অনুপ্রবেশকারী” এবং যারা তাদের রাজ্যের কল্যাণ প্রকল্প গুলোর সুবিধা পাইয়ে দিচ্ছেন—তাদের জবাবদিহি করতে হবে। তাঁর দলের নেতারাও একই কথা বলে এসেছেন। বিজেপি নেতা ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, এই “শনাক্ত করো, মুছে ফেলো এবং বিতাড়িত করো” অভিযানের মাধ্যমে রাজ্যের ভোটার তালিকা থেকে অ-ভারতীয় নাম পরিষ্কার করা হবে।
পশ্চিমবঙ্গের নতুন নেতৃত্ব এটাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার দু’ দিন পর, ১৩ মে শুভেন্দু অধিকারী সাংবাদিকদের বলেন, “কোনো মৃত ব্যক্তি, অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বা অ- ভারতীয় ব্যক্তিকে রাজ্যের নাগরিকদের জন্য নির্ধারিত সুবিধা নিতে দেওয়া হবে না।” শুভেন্দু অধিকারীর এই দাবির পর রাজ্য সরকার যে আদেশনামা জারি করেছিল, তার একটি কপি রিপোর্টার্স কালেকটিভ পর্যালোচনা করেছে।
৪-ঠা জুনে পাঠানো এই আদেশে রাজ্যের ভর্তুকিপ্রাপ্ত খাদ্য প্রকল্পের সুবিধাভোগী তালিকা থেকে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ বা ‘অ-ভারতীয়’ব্যক্তিদের সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়নি। তার পরিবর্তে এই আদেশে অনুযায়ী রাজ্য কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে- এস আই আর (SIR)-এর সময় যেসব ভোটার মৃত, স্থানান্তরিত, অনুপস্থিত অথবা যাদের কাছে দুইয়ের বেশি ভোটার পরিচয়পত্র আছে, তাদের ভর্তুকি প্রকল্প থেকে সরিয়ে দিতে হবে। এছাড়া, যেসব ভোটারকে সংশোধনের সময় সন্দেহজনক বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল এবং পরে বিচার-বিশ্লেষণের পর তাদের দেওয়া তথ্য ভুল প্রমাণিত হয়েছে, তাদেরকেও সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে।
এই আদেশ শুধুমাত্র এস আই আর-এ নাম বাদ পড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং ভর্তুকিপ্রাপ্ত খাদ্যের জন্য কারা যোগ্য তাও ঠিক করে দিচ্ছে। এতে পোলিং অফিসারদের অনুমতি দেওয়া হয়েছে যে, এস আই আর-এ আগেই ছাড়পত্র পাওয়া ভোটারদের মধ্যে যারা ভোটের আগে হারিয়ে গেছেন বলে মনে হয়েছে, তাদের তথ্য আবার যাচাই করে পাবলিক ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম (PDS) -এর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে। এই শ্রেণির ভোটারদের যাচাইয়ের পদ্ধতি কী হবে তা এখনও পর্যন্ত স্পষ্ট নয়।

এটাই হয়তো হওয়ার ছিল। কারণ, এস আই আর প্রক্রিয়া শুরু থেকেই ভোটার পরিচয়পত্রধারী কাউকেই স্পষ্টভাবে ‘অবৈধ’নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করেনি।
ভারতের নির্বাচন কমিশন তখন যা বলছিল, আর এখন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী যেভাবে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের যেভাবে নিশানা করছেন—সেটা শুধু বাগাড়ম্বর করার মতই শোনাচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্টও এই বিষয়ে সায় দিয়েছে। ২৭ মে তারিখে এসআইআর-এর বৈধতা বজায় রেখে দেওয়া চূড়ান্ত রায়ে আদালত নির্বাচন কমিশনকে বলেছে, যাদের অ-নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে অর্থাৎ যাদের শুভেন্দু অধিকারী ‘অ-ভারতীয়’বলেন , তাদের নাম চার সপ্তাহের মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে জমা দিতে।
একইসঙ্গে শীর্ষ আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এস আই আর-এর সময় ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটা গেলে কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্বের অধিকার বাতিল হবে না। তবে নির্বাচন কমিশন শুধুমাত্র ভোটার তালিকা সংশোধনের ‘সীমিত’উদ্দেশ্যে নাগরিকত্বের দাবি যাচাই করতে পারবে।
এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন প্রকাশ্যে জানায়নি যে, পশ্চিমবঙ্গে এস আই আর-এর সময় এমন কোনো সন্দেহভাজন অ-নাগরিকের তালিকা তৈরি করা হয়েছিল কি না। কিন্তু এতেও বাগাড়ম্বর কিন্তু থামেনি। বিজেপি নেতারা, এমনকি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীও, প্রকাশ্য বিবৃতিতে বলছেন যে এই অভিযানে যাদের নাম কাটা হয়েছে তাদের অ-ভারতীয় হিসেবে গণ্য করা হবে। এটা সুপ্রিম কোর্ট যে সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে—এস আই আর-এ নাম কাটার ফলে কারও নাগরিকত্বের ওপর কী প্রভাব পড়বে—তার সরাসরি বিরোধী।
পশ্চিমবঙ্গে ৪ নভেম্বর ২০২৫ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত যে এসআইআর চলেছিল তাতে রাজ্যের ভোটার তালিকা থেকে ৯১ লক্ষের বেশি ভোটারকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৪ লক্ষ মানুষ মধ্য এপ্রিলের মধ্যে এস আই আর ট্রাইব্যুনালে আপিল করেছেন। রাজ্য নির্বাচন কমিশন এখনও প্রকাশ্যে জানায়নি যে এই আপিলগুলোর মধ্যে কতগুলো নিষ্পত্তি হয়েছে। তবে স্থানীয় কর্মীরা জানিয়েছেন, এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত এসআইআর ট্রাইব্যুনালে মাত্র ২,৩০০-এর বেশি আপিল নিষ্পত্তি হয়েছে, যা মোট অপেক্ষমাণ আপিলের একটা ক্ষুদ্র অংশ। এই বিষয়ে কমিশন আমাদের প্রশ্নের কোনো উত্তর দেয়নি।

{{cta-block}}
কল্যাণমূলক প্রকল্পের তালিকার বাদ পড়া নাম
৪ জুন পশ্চিমবঙ্গ খাদ্য ও সরবরাহ দপ্তর একটি বারো দিনের যাচাই ও বাদ দেওয়ার অভিযান ঘোষণা করে। এর উদ্দেশ্য ছিল এসআইআর-এর ফলাফলের ভিত্তিতে পাবলিক ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম (পিডিএস)-এর অযোগ্য সুবিধাভোগীদের বাদ দেওয়া, যাতে তারা আর সরকারি ভর্তুকিযুক্ত খাদ্যশস্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পাবেন না। এই প্রক্রিয়ার সময়সীমা ছিল ১৫ জুন।
রাজনৈতিক বক্তৃতায় যা বলা হয়েছে তার বিপরীতে, দ্য কালেকটিভ দেখেছে যে রাজ্যের পিডিএস থেকে সুবিধাভোগীদের বাদ দেওয়ার এই অভিযানে ব্যক্তিদের বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত না করেই কার্যত তাদের সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
তথ্য যাচাই করার জন্য কর্মচারি দের দুটি বিষয় দেখতে হয়েছে: সংশোধনের সময় যাদের নাম কাটা হয়েছে, তারা এসআইআর ট্রাইব্যুনালে আপিল করেছেন কি না, অথবা নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (সিএএ)-এর অধীনে ভারতীয় নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেছেন কি না। বাকি সব নাম, যাচাই হওয়ার পর , পিডিএস সুবিধাভোগীদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হবে।
দক্ষিণ পশ্চিমবঙ্গের একজন জেলাশাসক দ্য কালেকটিভকে জানিয়েছেন যে, রাজ্য এই আপডেট করা সুবিধাভোগীদের তালিকা রাজ্যের অন্যান্য কল্যাণমূলক প্রকল্পে ব্যবহার করার পরিকল্পনা করছে।
পশ্চিমবঙ্গের মহিলা ও শিশু উন্নয়নমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল ইতিমধ্যেই এমন একটি পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এসআইআর-এ যেসব মহিলাদের নাম কাটা হয়েছে, তারা রাজ্যের মহিলাদের জন্য নগদ সাহায্যের আন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্পের সুবিধা পাবেন না— যেটি তৃণমূল সরকারের সময়ে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার নামে পরিচিত।
১৩ মে একটি বিবৃতিতে অগ্নিমিত্রা পাল জানান-“যারা লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পাচ্ছিলেন, তারা এখন আন্নপূর্ণা ভাণ্ডার পাবেন। আর যাদের নাম কাটা হয়েছে (এসআইআর-এ), তাদের নাম বিশ্লেষণ করা হবে। বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গ্যারা, যারা অ-নাগরিক, তারা এই প্রকল্পের জন্য যোগ্য নন। “যারা বাদ দেওয়ার বিরুদ্ধে আপিল করেছেন, তারা সুবিধা পাবেন। যারা সিএএ-এর অধীনে আবেদন করেছেন, তারাও এই প্রকল্পের জন্য যোগ্য।”
ভারতীয় নির্বাচন কমিশন কি অ-নাগরিকদের চিহ্নিত করেছে?
কমিশন গত বছর যখন এই সংশোধনী অভিযানের ঘোষণা করেছিল, তখন দেশজুড়ে ভোটার তালিকায় অবৈধ নাগরিকদের থাকার কথা উল্লেখ করে এই অভিযানের যৌক্তিকতা প্রমাণ করেছিল।
২০২৫ সালের ২৪ জুন এই অভিযান ঘোষণার সময় নির্বাচন কমিশন উল্লেখ করেছিল যে, “দ্রুত নগরায়ণ, ঘন ঘন স্থানান্তর, তরুণ নাগরিকদের ভোটাধিকার লাভ, মৃত্যুর খবর না জানানো এবং বিদেশি অবৈধ অভিবাসীদের নাম অন্তর্ভুক্তির মতো নানা কারণে নির্বাচনী তালিকার সততা বজায় রাখতে এবং ত্রুটিমুক্ত তালিকা তৈরি করতে একটি জোরদার সংশোধনী অভিযান চালানো প্রয়োজন হয়ে পড়েছে,”
এরপর থেকে ভোটার তালিকায় বিদেশি বা অ-ভারতীয়দের খুঁজে পাওয়া নিয়ে কোনো পরিসংখ্যানই কমিশন প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
নাম মুছে ফেলার জন্য যে সমস্ত শর্ত কমিশন এসআইআর-এর সময় উল্লেখ করেছিল, বিশেষ করে দ্বিতীয় পর্যায়ে যেখানে পশ্চিমবঙ্গে সংশোধনী চলেছিল, সেখানে অ-ভারতীয় হওয়াকে তালিকা থেকে সরিয়ে দেওয়ার স্পষ্ট কোনো কারণ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
তা সত্ত্বেও, ৪ জুনের আদেশ অনুসারে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এসআইআর-এ মুছে ফেলা নামগুলো ব্যবহার করে পিডিএস থেকে মানুষদের সরিয়ে দিচ্ছে এবং সম্ভবত অন্যান্য কল্যাণ প্রকল্প থেকেও।
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, দায়িত্বে থাকা “এরিয়া ইন্সপেক্টর”দের তাদের নির্বাচনী এলাকার ঘরে ঘরে গিয়ে যাচাই করতে হবে, ইলেকটোরাল রোল অফিসারের কাছ থেকে বুথ-ভিত্তিক মুছে ফেলা ভোটারদের তালিকা সংগ্রহ করতে হবে এবং তাদের শারীরিক উপস্থিতি যাচাই করতে হবে। এই যাচাই প্রক্রিয়া শুধু এস আই আর-এর সিদ্ধান্ত বহাল রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ এবং নাগরিকত্বের কোনো প্রশ্নে কিছু বলছে না।
দ্য কালেকটিভের পক্ষ থেকে পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন কমিশন, মুখ্যমন্ত্রীর দফতর এবং খাদ্য ও সরবরাহ দফতরকে বেশ কিছু প্রশ্ন পাঠানো হয়েছিলো। প্রশ্ন ছিল— নির্বাচন কমিশন সন্দেহভাজন “অ-ভারতীয়” দের কোনো তালিকা তৈরি করে রাজ্য সরকার কে দিয়েছে কি না। প্রকাশের সময় পর্যন্ত কেউই এই প্রশ্নের উত্তর দেয়নি। পরবর্তীতে কোনো উত্তর পেলে প্রতিবেদনটিতে তা সংযোজন করা হবে।
আমরা নির্বাচন কমিশনকে এও জিজ্ঞাসা করেছি, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুসারে তারা সন্দেহভাজন অ-ভারতীয়দের তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সঙ্গে শেয়ার করেছে কি না। আমরা সেটারও উত্তরের অপেক্ষায় আছি।
নতুন সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকের ঠিক পরেই, অধিকারী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তাঁর সরকার রাজ্যের কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোর সুবিধা নেওয়া অনুপ্রবেশকারীদের বিতাড়িত করবে। কিন্তু সরকার, বিদেশি অনুপ্রবেশকারীদের কোনো প্রমাণিত তালিকা তৈরি না করে, রাজ্য সরকার এখন সক্রিয়ভাবে এস আই আর-কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। বর্তমানে ভোটার তালিকা সংশোধন করার এই প্রক্রিয়াকে বাতিল করার কল হিসাবে ব্যাবহার করা হচ্ছে। এখনও একজনও প্রমাণিত অনুপ্রবেশকারীর নাম প্রকাশ না করে, এই প্রক্রিয়ার সাহায্যে সরকার লক্ষ লক্ষ নাগরিককে রাজ্যের সুবিধা থেকে বঞ্চিত করতে পারে।

.avif)




